পশ্চিমবঙ্গে সংস্কৃত দিবস: হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার এক ঐতিহাসিক সূচনা
পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি করেছে। সেই নির্দেশ অনুযায়ী ২৫ থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে রাজ্যের সমস্ত সরকারি, সরকার-পোষিত, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একদিন সংস্কৃত দিবস পালন করা হবে। দীর্ঘদিন পর রাজ্য সরকার এই উদ্যোগ নেওয়ায় সংস্কৃতপ্রেমীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
"আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, স্বাধীনতার পর এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে সরকারি উদ্যোগে এত বৃহৎ পরিসরে সংস্কৃত দিবস পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং ভারতের প্রাচীন জ্ঞান-ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানানোর একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।"
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস, সিপিআই(এম) এবং পরে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় ছিল। আমার মতে, সেই সময়ে সংস্কৃত ভাষা ও ভারতীয় ঐতিহ্যকে যে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল, তা দেওয়া হয়নি। ফলে নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ সংস্কৃত ভাষার প্রকৃত মাহাত্ম্য ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আজকের এই উদ্যোগ সেই হারিয়ে যাওয়া গৌরবকে আবার ফিরিয়ে আনার একটি ইতিবাচক প্রচেষ্টা বলে আমি মনে করি।
সভ্যতার আত্মা: সংস্কৃত ভাষা
সংস্কৃত শুধু একটি ভাষা নয়; এটি ভারতীয় সভ্যতার আত্মা। বেদ, উপনিষদ, গীতা, রামায়ণ, মহাভারত, যোগশাস্ত্র, আয়ুর্বেদ, দর্শন, গণিত ও ব্যাকরণের অমূল্য ভাণ্ডার সংস্কৃত ভাষায় রচিত। পৃথিবীর বহু গবেষক আজও সংস্কৃত ভাষার বৈজ্ঞানিক গঠন ও ব্যাকরণ নিয়ে গবেষণা করছেন।
মন্ত্রপাঠ: বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক দিক
আমাদের প্রাচীন ঋষি-মুনিরা বিশ্বাস করতেন, শুদ্ধভাবে সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ করলে মন একাগ্র হয়, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় এবং মানসিক প্রশান্তি লাভ করা যায়। অনেক সাধক ও যোগাচার্যও মনে করেন, নিয়মিত মন্ত্রপাঠ মানুষের চিন্তাশক্তি, স্মৃতিশক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের চর্চায় সহায়ক হতে পারে। তাই হাজার হাজার বছর ধরে ভারতীয় সংস্কৃতিতে মন্ত্রপাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।
নতুন প্রজন্মের জন্য অনন্য সুযোগ
আজকের ডিজিটাল যুগে যখন নতুন প্রজন্ম নিজের শিকড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখন বিদ্যালয়ে সংস্কৃত দিবস পালন তাদের কাছে ভারতীয় সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরার এক অনন্য সুযোগ। শিশুদের মধ্যে ভাষার প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে, তারা আমাদের প্রাচীন সাহিত্য সম্পর্কে জানবে এবং নিজের সংস্কৃতির প্রতি গর্ব অনুভব করবে।
আমার বিশ্বাস, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে। শুধু একদিনের অনুষ্ঠান নয়, সারা বছর ধরে সংস্কৃত ভাষা, সাহিত্য ও ভারতীয় জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিত করার পরিবেশ গড়ে উঠুক। পশ্চিমবঙ্গ আবার সংস্কৃত শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক—এই প্রত্যাশাই রইল।