August 19, 2026

মালদার ভারতভুক্তি দিবস: যে ইতিহাসে স্বাধীনতার পরও তিন দিন অনিশ্চয়তায় ছিল মালদা

Malda Bharat Bhukti Dibas

মালদার ‘ভারতভুক্তি দিবস’ আসলে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত ইতিহাস। তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার—র‌্যাডক্লিফ অ্যাওয়ার্ড ১৭ আগস্ট ১৯৪৭ প্রকাশিত হয়, আর মালদায় ভারতীয় প্রশাসনের অধীনে আসার ঘটনাকে স্মরণ করে স্থানীয়ভাবে ১৮ আগস্ট ‘ভারতভুক্তি দিবস’ পালন করা হয়।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। সারা ভারত তখন স্বাধীনতার আনন্দে উদ্বেল। দীর্ঘ প্রায় দুইশো বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটেছে। দিল্লি থেকে কলকাতা—সর্বত্র উড়ছে তেরঙ্গা। কিন্তু সেই সময় বাংলার মালদার মানুষের কাছে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশ স্বাধীন হলেও মালদা তখনও নিশ্চিতভাবে জানত না—তারা ভারতেই থাকবে, নাকি সদ্য গঠিত পাকিস্তানের অংশ হবে। এই ঐতিহাসিক ঘটনাকেই স্মরণ করে মালদায় প্রতি বছর ১৮ আগস্ট ‘ভারতভুক্তি দিবস’ পালন করা হয়।

স্বাধীনতার প্রাক্কালে মালদার অনিশ্চয়তা

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতকে ভারত ও পাকিস্তান—দুই রাষ্ট্রে ভাগ করার সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাকে ভাগ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বেঙ্গল বাউন্ডারি কমিশনকে, যার চেয়ারম্যান ছিলেন ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফ। তাঁকে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের সীমারেখা নির্ধারণ করতে হয়েছিল।

দেশভাগের প্রাথমিক ঘোষণায় মালদার ভবিষ্যৎ নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, তার সুযোগে পাকিস্তানের অংশ হওয়ার প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল। ঐতিহাসিক গবেষণায় উল্লেখ আছে, মালদা শহরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানের পক্ষে মিছিল ও পতাকা উত্তোলনের ঘটনাও ঘটেছিল। এমনকি মালদা কালেক্টরেটেও পাকিস্তানের পতাকা ওড়ার কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হলেও মালদার মানুষের কাছে তখনও স্পষ্ট ছিল না তাঁদের প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ কী হতে চলেছে।

১৭ আগস্ট প্রকাশ পেল র‌্যাডক্লিফের সিদ্ধান্ত

অবশেষে ১৭ আগস্ট র‌্যাডক্লিফ অ্যাওয়ার্ড প্রকাশিত হয়। তখন পরিষ্কার হয়ে যায় যে মালদা জেলার বৃহৎ অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হবে। তবে পুরো পুরনো মালদা জেলা একসঙ্গে ভারতে আসেনি।

ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী তৎকালীন মালদার ১৫টি থানার বিভাজন:

  • পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত: শিবগঞ্জ, ভোলাহাট, নাচোল, গোমস্তাপুর ও নবাবগঞ্জ।
  • ভারতের অন্তর্ভুক্ত: বাকি সমস্ত অংশ।

এই সিদ্ধান্ত মালদার মানুষের কাছে বিরাট স্বস্তির খবর হয়ে আসে।

১৮ আগস্ট কেন ‘ভারতভুক্তি দিবস’?

র‌্যাডক্লিফ অ্যাওয়ার্ড ১৭ আগস্ট প্রকাশিত হলেও বাস্তবে প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং ভারতীয় পতাকা উত্তোলনের ঘটনা পরের দিন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়। তাই মালদায় ১৮ আগস্ট দিনটিকে ভারতভুক্তির স্মারক দিবস হিসেবে পালন করার ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে। ১৫ আগস্ট গোটা ভারতের স্বাধীনতা দিবস হলেও মালদার মানুষের কাছে ১৮ আগস্টের রয়েছে আলাদা আবেগ ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

শুধু মালদা নয়: ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় নদিয়ার কিছু এলাকাও প্রথমে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত বলে ধরা হয়েছিল। পরে সীমারেখা সংশোধনের ফলে সেগুলি ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৮ আগস্ট সেখানেও ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। তাই আজও দিনটি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও দেশাত্মবোধক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্মরণ করা হয়।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা

মালদার ভারতভুক্তির ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা শুধু ১৫ আগস্টের একটি দিনের ঘটনা ছিল না। দেশভাগের সময় ভারতের বহু অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চিত ছিল। কোথাও সীমান্ত বদলেছে, কোথাও মানুষ রাতারাতি অন্য দেশের নাগরিক হয়ে গিয়েছিল, আবার কোথাও কয়েকদিন অপেক্ষার পর জানা গিয়েছিল—তাদের এলাকা ভারতেরই অংশ।

১৫ আগস্ট গোটা ভারতের স্বাধীনতার দিন। আর মালদার মানুষের কাছে ১৮ আগস্ট—ভারতের সঙ্গে তাঁদের ভূমির চূড়ান্ত সংযুক্তির স্মরণীয় দিন, ‘ভারতভুক্তি দিবস’। এই ইতিহাস যত বেশি নতুন প্রজন্ম জানবে, ততই বোঝা যাবে স্বাধীনতার মূল্য, দেশভাগের যন্ত্রণা এবং নিজের মাটির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ।