তামিল ভাষা নাকি সংস্কৃত ভাষা—কোনটি অধিক প্রাচীন? ভারতীয় শাস্ত্র, ইতিহাস ও ভাষাবিজ্ঞানের আলোকে একটি বিশদ পর্যালোচনা
ভূমিকা
ভারতবর্ষের ভাষাগত ঐতিহ্য পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন। এই ঐতিহ্যের দুই উজ্জ্বল স্তম্ভ হল সংস্কৃত ও তামিল। প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে—কোন ভাষাটি অধিক প্রাচীন? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আমরা কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিচার করছি। যদি হিন্দু শাস্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করি, তবে সংস্কৃতকে অনাদি, অপৌরুষেয় এবং দেবভাষা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্যদিকে, আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান উভয় ভাষাকেই অত্যন্ত প্রাচীন ও স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে মূল্যায়ন করে।
সংস্কৃত: দেবভাষার ধারণা
হিন্দু ধর্মগ্রন্থে সংস্কৃতকে দেবভাষা (देववाणी) বলা হয়েছে। কারণ বেদ, উপনিষদ, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, গীতা, রামায়ণ, মহাভারত এবং অধিকাংশ দর্শনশাস্ত্র সংস্কৃত ভাষায় রচিত। মনুস্মৃতি (২.৬)-তে বলা হয়েছে—
«वेदोऽखिलो धर्ममूलम्।»
অর্থাৎ, সমস্ত ধর্মের মূল হলো বেদ।
বেদ যেহেতু বৈদিক সংস্কৃত ভাষায় সংরক্ষিত, তাই শাস্ত্রে সংস্কৃত সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করেছে।
বেদ ও বৈদিক সংস্কৃত
চারটি বেদ হলো—
এর মধ্যে ঋগ্বেদকে ভারতীয় ভাষার সর্বপ্রাচীন সংরক্ষিত গ্রন্থ হিসেবে বহু গবেষক বিবেচনা করেন। এর ভাষা হলো বৈদিক সংস্কৃত। গবেষকদের সাধারণ ধারণা অনুযায়ী ঋগ্বেদের সংকলন খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে সম্পন্ন হয়েছিল এবং এটি দীর্ঘকাল মৌখিক পরম্পরায় সংরক্ষিত ছিল।
শাস্ত্র মতে সংস্কৃত কি মানবসৃষ্ট?
হিন্দু দর্শনে বেদকে বলা হয় অপৌরুষেয়—অর্থাৎ মানুষের রচিত নয়। মীমাংসা দর্শন অনুসারে—
- বেদ অনাদি।
- বেদের শব্দও অনাদি।
- ঋষিরা বেদ রচনা করেননি; তাঁরা তপস্যার মাধ্যমে বেদকে উপলব্ধি করেছিলেন।
এই কারণেই বহু বৈদিক আচার্য সংস্কৃতকে সাধারণ মানবভাষা নয়, বরং ঈশ্বরপ্রদত্ত দেবভাষা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
পাণিনি ও সংস্কৃত ব্যাকরণ
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দীতে মহর্ষি পাণিনি তাঁর অষ্টাধ্যায়ী রচনা করেন। এই গ্রন্থকে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাকরণগ্রন্থগুলির একটি বলা হয়। পাণিনি বিদ্যমান সংস্কৃত ভাষার নিয়মকে সুসংহত করেন; তিনি ভাষাটি সৃষ্টি করেননি।
তামিল ভাষার প্রাচীনত্ব
তামিল দ্রাবিড় ভাষাপরিবারের অন্যতম প্রধান ভাষা। প্রাচীন তামিলের লিখিত নিদর্শন সাধারণভাবে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী থেকে পাওয়া যায়। টোল্কাপ্পিয়ম এবং সঙ্গম সাহিত্য তামিলের প্রাচীন সাহিত্য হিসেবে সুপরিচিত। তামিল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন জীবন্ত ভাষা এবং ভারত সরকারের স্বীকৃত শাস্ত্রীয় ভাষাগুলির একটি।
সংস্কৃত ও তামিল—তাদের সম্পর্ক
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— সংস্কৃত ও তামিল একই ভাষাপরিবারের নয়।
অতএব, তামিল সংস্কৃত থেকে জন্মায়নি, আবার সংস্কৃতও তামিল থেকে উৎপন্ন নয়। উভয় ভাষাই স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়েছে।
তাহলে কোন ভাষা বেশি প্রাচীন?
শাস্ত্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি
- সংস্কৃত অনাদি।
- বেদ অনাদি।
- সংস্কৃতই দেবভাষা।
অতএব, শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় সংস্কৃতই প্রাচীনতম ভাষা।
আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান
- ঋগ্বেদ ভারতীয় ভাষার সর্বপ্রাচীন সংরক্ষিত গ্রন্থ।
- এর ভাষা বৈদিক সংস্কৃত।
- তামিলের প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শন পরবর্তী সময়ের।
তবে, তামিলও বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন জীবন্ত ভাষা এবং তার স্বতন্ত্র বিকাশের ইতিহাস রয়েছে।
কেন বিতর্ক সৃষ্টি হয়?
এই বিতর্কের প্রধান কারণ—
- ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভাষাবিজ্ঞান ভিন্ন পদ্ধতিতে বিষয়টি বিচার করে।
- শাস্ত্র সংস্কৃতকে অনাদি বলে, কিন্তু আধুনিক গবেষণা ভাষার লিখিত ও ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেয়।
- তামিল ও সংস্কৃত—উভয় ভাষারই দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে।
উপসংহার
ভারতীয় শাস্ত্রের আলোকে সংস্কৃত কেবল একটি ভাষা নয়; এটি বেদ, উপনিষদ, দর্শন, আধ্যাত্মিকতা এবং ভারতীয় সভ্যতার মূল ভিত্তি। শাস্ত্র অনুযায়ী সংস্কৃত অনাদি এবং দেবভাষা।
অন্যদিকে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানও স্বীকার করে যে বৈদিক সংস্কৃতের প্রাচীন সাহিত্যিক ঐতিহ্য অত্যন্ত প্রাচীন এবং ঋগ্বেদ ভারতীয় ভাষার সর্বপ্রাচীন সংরক্ষিত গ্রন্থগুলির মধ্যে অন্যতম। একই সঙ্গে তামিলও বিশ্বের প্রাচীনতম জীবন্ত ভাষাগুলির একটি এবং ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। সুতরাং, ভারতীয় শাস্ত্রের ভিত্তিতে সংস্কৃতকে প্রাচীনতম ও দেবভাষা বলা হয়। আর আধুনিক একাডেমিক গবেষণায় বৈদিক সংস্কৃতের প্রাচীন সাহিত্যিক ঐতিহ্য তামিলের প্রাচীন লিখিত নিদর্শনের তুলনায় অধিক প্রাচীন বলে বিবেচিত হলেও, উভয় ভাষাকেই ভারতের দুই মহান ও স্বতন্ত্র শাস্ত্রীয় ভাষা হিসেবে সম্মান করা হয়।