ভারতবর্ষে সংস্কৃত ভাষার বর্তমান অবস্থা: সংস্কৃত গ্রাম, সংস্কৃতভাষী মানুষ ও বিশ্ববিদ্যালয়
সংস্কৃত ভাষা ভারতীয় সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন, সমৃদ্ধ ও জ্ঞানবহ ভাষা। বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, দর্শন, আয়ুর্বেদ, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, নাট্যশাস্ত্র, ব্যাকরণ এবং সাহিত্য—প্রায় সমস্ত প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞানভাণ্ডারের মূল ভাষা হলো সংস্কৃত। এই ভাষাকে কেবল একটি ধর্মীয় ভাষা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, নৈতিকতা ও সংস্কৃতির ভিত্তি।
ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে সংস্কৃত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং এটি ভারতের স্বীকৃত ২২টি তফসিলভুক্ত ভাষার একটি। অনেকেই মনে করেন সংস্কৃত একটি মৃত ভাষা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আজও দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেদ পাঠশালা এবং সংস্কৃত শিক্ষাকেন্দ্রে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী সংস্কৃত অধ্যয়ন করছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মন্ত্রোচ্চারণ, পূজা-পার্বণ, যোগ ও দর্শনচর্চায় প্রতিদিন সংস্কৃত ব্যবহৃত হচ্ছে।
সংস্কৃত গ্রাম কী?
যে গ্রামে সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন কথোপকথনে সংস্কৃত ব্যবহার করেন, সেই গ্রামকে সাধারণভাবে "সংস্কৃত গ্রাম" বলা হয়। এখানে বাড়িতে, বিদ্যালয়ে, বাজারে এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে সংস্কৃত ভাষা ব্যবহারের প্রচলন দেখা যায়। ভারত সরকার কোনো নির্দিষ্ট সরকারি তালিকা প্রকাশ করেনি যে দেশে ঠিক কতগুলি সংস্কৃত গ্রাম রয়েছে। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ভারতে প্রায় ৮ থেকে ১২টি গ্রাম সংস্কৃত ভাষার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
উল্লেখযোগ্য সংস্কৃত গ্রামসমূহ:
- মত্তুর (কর্ণাটক)
- হোসাহল্লি (কর্ণাটক)
- ঝিরি (মধ্যপ্রদেশ)
- বাঘুয়ার (মধ্যপ্রদেশ)
- সাসানা (ওড়িশা)
- ভান্তোলা (উত্তরাখণ্ড)
এই গ্রামগুলিতে সংস্কৃত কেবল পাঠ্যবিষয় নয়; মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রারও একটি অংশ।
ভারতবর্ষে কতজন সংস্কৃত ভাষায় কথা বলেন?
ভারতের ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ২৪,৮২১ জন মানুষ সংস্কৃতকে তাঁদের মাতৃভাষা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এই সংখ্যা দেখে সংস্কৃতের প্রকৃত ব্যবহার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। কারণ বহু মানুষ সংস্কৃতকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষা হিসেবে জানেন।
২০১১ সালের জনগণনার তথ্য অনুযায়ী—
- দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে সংস্কৃত জানেন প্রায় ১১.৩৪ লক্ষ মানুষ।
- তৃতীয় ভাষা হিসেবে সংস্কৃত জানেন প্রায় ১৯.৬৪ লক্ষ মানুষ।
অর্থাৎ মোট মিলিয়ে প্রায় ৩১ লক্ষেরও বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে সংস্কৃত ভাষায় দক্ষ বা ব্যবহারকারী।
এছাড়া প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ গীতা পাঠ, বেদমন্ত্র, পূজা, যজ্ঞ, সংস্কৃত স্তোত্র, শ্লোক এবং ধর্মীয় আচারে সংস্কৃত উচ্চারণ করেন। তাই সংস্কৃতের ব্যবহার কেবল জনগণনার মাতৃভাষার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়।
সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা
বর্তমানে ভারতে প্রায় ১৮টি সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে—
- ৩টি কেন্দ্রীয় সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়
- ১টি ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়
- ১৪টি রাজ্য সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়
উল্লেখযোগ্য কেন্দ্রীয় সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়:
- Central Sanskrit University, New Delhi
- Shri Lal Bahadur Shastri National Sanskrit University, New Delhi
- National Sanskrit University, Tirupati
সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ে সংস্কৃত শিক্ষা
শুধু সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয় নয়, ভারতের প্রায় ১২০টি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়েও স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে সংস্কৃত পড়ানো হয়। এছাড়া দেশে প্রায় ৫,০০০টি ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃত পাঠশালা এবং ১,০০০টিরও বেশি বেদ পাঠশালা রয়েছে।
ভারতের বহু রাজ্যে বিদ্যালয়ে সংস্কৃত ঐচ্ছিক বা তৃতীয় ভাষা হিসেবে পড়ানো হয়। বিভিন্ন সরকারি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে কোটি কোটি শিক্ষার্থী কোনো না কোনো স্তরে সংস্কৃত শিক্ষা গ্রহণ করে। এর ফলে সংস্কৃত আজও শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে আছে।
সংস্কৃত ভাষার গুরুত্ব
সংস্কৃতকে বিশ্বের অন্যতম বৈজ্ঞানিক ব্যাকরণসমৃদ্ধ ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাণিনির 'অষ্টাধ্যায়ী' আজও ভাষাবিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে। সংস্কৃত ভাষার গুরুত্বের কয়েকটি দিক—
- ভারতীয় দর্শনের মূল ভাষা।
- বেদ, উপনিষদ, গীতা, রামায়ণ ও মহাভারতের ভাষা।
- আয়ুর্বেদ, যোগ, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতের বহু প্রাচীন গ্রন্থ সংস্কৃতে রচিত।
- আধুনিক ভাষাতত্ত্ব ও কম্পিউটার ভাষাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও সংস্কৃত নিয়ে গবেষণা চলছে।
- ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বোঝার জন্য সংস্কৃত জ্ঞান অপরিহার্য।
বর্তমান সময়ে সংস্কৃতের পুনর্জাগরণ
গত কয়েক দশকে সংস্কৃত শিক্ষার প্রতি আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান কথ্য সংস্কৃত শিবির, অনলাইন ক্লাস, গবেষণা প্রকল্প এবং সংস্কৃত প্রচারের বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে। বহু গ্রামে সংস্কৃত কথোপকথন শেখানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সংস্কৃত কেবল অতীতের ভাষা নয়; এটি ভারতের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ২০১১ সালের জনগণনায় মাত্র ২৪,৮২১ জন সংস্কৃতকে মাতৃভাষা হিসেবে উল্লেখ করলেও বাস্তবে কয়েক মিলিয়ন মানুষ দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষা হিসেবে সংস্কৃত জানেন এবং কোটি কোটি মানুষ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে সংস্কৃত ব্যবহার করেন।
দেশে একাধিক সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়, হাজার হাজার পাঠশালা এবং বহু সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত শিক্ষা আজও অব্যাহত রয়েছে। সংস্কৃত গ্রামগুলির উদ্যোগ প্রমাণ করে যে এই ভাষা কেবল সংরক্ষিত ঐতিহ্য নয়, জীবন্ত সাংস্কৃতিক চর্চারও অংশ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ভারতের জ্ঞান-ঐতিহ্য পৌঁছে দিতে সংস্কৃত ভাষার অধ্যয়ন ও প্রসার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।